আজকে আমরা গণিতের একটি মজার বিষয় ক্যালকুলাসের ইতিহাস নিয়ে আলোচনা করব। অনেকে হয়তো ভাববেন গণিতের জটিল জটিল তত্ব নিয়ে কথা বলব কিন্তু না, আমরা আজকে কথা বলব ক্যালকুলাস কিভাবে আমাদের মাঝে এই পর্যায়ে চলে আসলো তা নিয়ে।
তার আগে আমরা জেনে নিই ক্যালকুলাস আসলে কি । আপনারা অনেকেই জানেন গণিতের যে শাখা পরিবর্তনশীল রাশি নিয়ে আলোচনা করে সেই শাখাটি হচ্ছে ক্যালকুলাস।
কিন্তু গণিতের এমন কোন শাখা নেই যেখানে ক্যালকুলাসের অবাধ বিচরণ নেই।
পদার্থবিজ্ঞানের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই ক্যালকুলাস ওতপ্রোতভাবে জড়িত। পদার্থবিজ্ঞানের অধিকাংশ তত্ত্ব প্রমাণ করতে গেলে ক্যালকুলাস এর দরকার হয়। সুতরাং বুঝতেই পারছেন ক্যালকুলাস গণিতের একটি প্রভাবশালী শাখা।
ক্যালকুলাস কিভাবে সর্বপ্রথম আবিষ্কৃত হলো ? মহান বিজ্ঞানী স্যার আইজ্যাক নিউটনের কথা আমরা সবাই জানি, আমার মতে বিজ্ঞানী নিউটন হচ্ছেন সকল বিজ্ঞানীদের বিজ্ঞানী । তিনি চিকিৎসা ক্ষেত্রে, পদার্থবিজ্ঞানে, গণিতে প্রতিটি ক্ষেত্রে সমান ভাবে বিচরণ করছিলেন ।
অপরদিকে বিখ্যাত গণিতবিদ গটফ্রিড লিবনিজ ও নিউটনের ক্যালকুলাসের আবিষ্কার নিয়ে দ্বন্দ্ব আজও পর্যন্ত আলোচিত হয় ।
আজকে আমরা সেই দ্বন্দ্বের কারণ এবং শেষ সমাধান কি তা নিয়ে আলোচনা করব ।
বেরো নামে নিউটনের একজন শিক্ষক ছিলেন, তিনি সর্বপ্রথম ক্যালকুলাসের স্পষ্ট ধারণা পোষণ করেছিলেন কিন্তু শেষ পর্যন্ত আর সেটি চলমান রাখেননি ।
সেই সূত্র ধরে নিউটন ক্যালকুলাস নিয়ে হালকা গবেষণা করেছিলেন, পরবর্তীতে নিউটন সেগুলো নিয়ে রীতিমত গবেষণা শুরু করে দিলেন এবং কয়েকটি গবেষণাপত্র প্রণয়ন করেন ।

আসলে নিউটন ছিলেন প্রচারবিমুখ তিনি আবিষ্কার করতেন বেশি এবং প্রচার করতেন কম । তিনি প্রচার করতেন বন্ধুবান্ধবের মধ্যে চিঠি আকার ।
এবং সে বিষয়ে বন্ধু-বান্ধবের কাছ থেকে বিভিন্ন ধরনের মতামত শুনতেন এবং পরবর্তীতে সেগুলো শুনে তিনি খুব খুশি হতেন।
প্রাথমিকভাবে ক্যালকুলাস নিয়ে নিউটন যে গবেষণাগুলো করতেন, যে তথ্যগুলো তৈরি করতেন সেগুলো বন্ধুবান্ধবের কাছে পৌঁছে দিতেন চিঠি লেখার আকারে ।
সেই চিঠি গণিতবিদ লিবনিজ ও পেয়েছিলেন ।
এভাবে নিউটন ক্যালকুলাসের মূল তত্ত্ব গুলো 16664 - 1666 মধ্যে তৈরি করে ফেলেন । এরপর নিউটন 1669 সালে তার প্রথম গবেষণা পত্র । 1671 সালে দ্বিতীয় গবেষণাপত্র এবং 1676 সালে তার তৃতীয় গবেষণা পত্র লেখেন । নিউটন যেহেতু প্রচারবিমুখ ছিলেন তাই তার প্রথম গবেষণাপত্র সর্বপ্রথম প্রকাশ করা হয় 1711 সালে যেটি তিনি লিখেছিলেন 1669 সালে । দ্বিতীয় টি প্রকাশিত হয় হয় 1736 সালে তার মৃত্যুর নয় বছর পর ।
অন্যদিকে গণিতবিদ লিবনিজ, 1674 সালে ক্যালকুলাস নিয়ে গবেষণা শুরু করেন এবং 1684 সালে তার গবেষণা জনসম্মুখে প্রকাশ করেন । লিবনিজ 6 পৃষ্ঠার গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন সেটি ছিল অস্পষ্ট, কিন্তু তার ধারনা গুলো সেই সময়ে সঠিক ছিল ।

ক্যালকুলাস আবিষ্কার নিয়ে নিউটন এবং লিবনিজ দ্বন্দ্বের মূল কারণ কি ছিল ? নিউটনের বন্ধুবান্ধব প্রচার করতেন এবং মনে করতেন নিউটন সর্বপ্রথম ক্যালকুলাস আবিষ্কার করেছেন, অপরদিকে লিবনিজের বন্ধুবান্ধব মনে করতেন লিবনিজ সর্বপ্রথম ক্যালকুলাস আবিষ্কার করেন । এই নিয়ে দুই জন গণিতবিদদের বন্ধুবান্ধবের মধ্যে শুরু হয় তুমুল তর্ক বিতর্ক । নিউটনের বন্ধুবান্ধব মনে করতেন ক্যালকুলাসের তথ্য চুরি করে কিঞ্চিৎ পরিবর্তন করে নিজের মতো করে তৈরি করে প্রকাশ করেছেন । তারা প্রমাণ হিসেবে নিউটনের প্রথম দিকে পাঠানো চিঠির কথা উল্লেখ করেন । এটি লিবনিজ কে অনেক অপমানিত করে নিজের বন্ধু-বান্ধব মহলে । সেই সময় বিজ্ঞানী গণিত, বিজ্ঞান, চিকিৎসা নিয়ে যারা গবেষণা করতেন তাদের সর্বোচ্চ সংস্থা ছিল রয়েল সোসাইটি |

রয়েল সোসাইটি সবগুলো নিয়ন্ত্রণ করত । লিবনিজ নিজেকে অপমানিত মনে করে রয়েল সোসাইটি বরাবর চিঠি লিখেন । কিন্তু রয়েল সোসাইটির পক্ষ থেকে লিবনিজ কে কোনরকম সান্তনা বা অন্যকিছু দেয়া হয়নি । অনেকেই তার কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন সেই সময়ে রয়েল সোসাইটির সভাপতি ছিলেন বিজ্ঞানী নিউটন নিজেই । সেই হিসেবে বিজ্ঞানী নিউটনের তত্ত্ব চুরির অপবাদে যখন বিচার চেয়ে চিঠি দিলেন তখন তার বিচার কি হতে পারে আপনারা বুঝতে পারছেন । লিবনিজ এর ক্ষেত্রে মনে হয় তাই হয়েছিল ।
অবশেষে কে ক্যালকুলাসের মূল আবিষ্কারক, ক্যালকুলাসের জনক এর তদন্ত করার জন্য রয়েল সোসাইটি থেকে তিন সদস্য বিশিষ্ট একটি কমিটি গঠন করা হয় । সব থেকে মজার বিষয় হচ্ছে ওই তিন সদস্যবিশিষ্ট কমিটি স্বয়ং নিউটন নিজেই ছিলেন । যেহেতু তিনি নিজেই ছিলেন এবং ক্যালকুলাস আবিষ্কারক হিসেবে নিউটনের সঙ্গে লিবনিজ জড়িত , সেহেতু তদন্ত কমিটি সূক্ষাতিসূক্ষ বিচার বিবেচনা করে রায় দিলেন ক্যালকুলাসের মূল আবিষ্কারক বিজ্ঞানী নিউটন ।
প্রতিবেদন প্রকাশের পরে লিবনিজ এর বন্দুমহল ক্ষোভে ফেটে পড়েন এবং প্রায় সময় অসময় দুই গ্রুপের মধ্যে তর্ক বিতর্ক লেগে থাকত । এত বিতরকের মাঝে ও বিংশ শতাব্দীর পূর্বে পর্যন্ত দুইজনকেই ক্যালকুলাসের জনক বলে ধরা হতো । কিন্তু গত শতাব্দীতে এসে বিজ্ঞানীরা একমত হন যে, নিউটন ক্যালকুলাসের জনক ।
তবে প্রকৃত বিজয় হয়েছে লিবনিজের ই । কেননা নিউটন যে ক্যালকুলাস আবিষ্কার করেছিলেন সেটি অনেক পুরনো । কিন্তু বর্তমানে স্কুল- কলেজে যে ক্যালকুলাস ব্যবহার করা হয় তার শতকরা 100 ভাগ লিবনিজের আবিষ্কৃত ক্যালকুলাস । সুতরাং
সিদ্ধান্তে আসতে পারি, ক্যালকুলাসের দ্বিতীয় আবিষ্কারক হচ্ছে লিবনিজ ।
লেখক,
এম. এম. শাহানুজ্জামান,
ইন্সট্রাক্টর,
ড্যাফোডিল পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট